করোনা মহামারির মধ্যে পানির দাম আরেক দফা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এবার ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার পরবর্তী বোর্ড সভায় মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন হতে পারে। আগামীকাল মঙ্গলবার বোর্ড সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের অনুমোদন হলে আগামী জুলাই মাস থেকে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানির জন্য দাম দিতে হবে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা, এর আগে যা ছিল ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা। আর বাণিজ্যিক সংযোগে দিতে হবে ৪২ টাকা, যা আগে ছিল ৪০ টাকা।

করোনা মহামারির শুরুর দিকে গত বছরের এপ্রিল মাসেও পানির দাম বাড়িয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। তখন আবাসিকে প্রতি ইউনিটে পানির দাম বেড়েছিল ২ টাকা ৮৯ পয়সা।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গত ১৩ বছরে ১৩ বার পানির দাম বাড়ানো হয়। এবার মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে মোট ১৪ বার পানির দাম বাড়বে। যদিও ঢাকা ওয়াসার পানির মান নিয়ে মানুষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত বছরের এপ্রিলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায়ও গ্রাহকদের অসন্তুষ্টির বিষয়টি উঠে এসেছিল। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা ওয়াসার সেবায় গ্রাহকদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসন্তুষ্ট। ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করেন। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করেন।

মহামারীতে পানির দাম বেড়ে অসহায় মানুষকে হতাশা করে তুলল

ওয়াসার পানিতে ময়লা, দুর্গন্ধ থাকায় মানুষের ভোগান্তি কতটা, তা বোঝাতে ২০১৯ সালের এপ্রিলে অভিনব এক কর্মসূচি পালন করেন জুরাইন নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়ক মিজানুর রহমান। তিনি ওয়াসার পানি দিয়ে বানানো শরবত খাওয়াতে চেয়েছিলেন সংস্থার এমডি তাকসিম এ খানকে। কারওয়ান বাজারে ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ের সামনে এক গ্লাস শরবত হাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত এমডির দেখা পাননি। বিষয়টি তখন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছিল।

রাজধানীর ইসলামবাগে ১৩ মার্চ গ্রাহকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ওয়াসার পানি ১০ মিনিট ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দেন ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তাঁরা যে পানি দিচ্ছেন, তা ড্রিংকেবল ওয়াটার (পানযোগ্য পানি), ড্রিংকিং ওয়াটার (পানীয়) নয়। পানযোগ্য পানি পান করা যাবে, তবে শর্ত সাপেক্ষে।

পানির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে গতকাল মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে সংস্থার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মোস্তফা তারেককে একই বিষয়ে মুঠোফোনে প্রশ্ন করা হয়। তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

এবার দাম বাড়ানোর বিষয়ে ওয়াসা বলছে, পানির উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে অনেক ব্যবধান। বর্তমানে প্রতি ১ হাজার লিটার পানি উৎপাদনে প্রায় ২৫ টাকা ব্যয় হচ্ছে। আর তা বিক্রি করতে হচ্ছে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সায়। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াসা মনে করে, পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন। ওয়াসার আইন ১৯৯৬–এর ২২ (২) ধারা অনুযায়ী ওয়াসা বোর্ড অনধিক ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়াতে পারে। এ জন্য ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়ালে বিদ্যমান দরের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, করোনা মহামারির এই সময়ে পানির দাম বাড়ানো অমানবিক। ওয়াসা পানি উৎপাদনের জন্য যে ব্যয়ের হিসাব দিচ্ছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা হিসাবের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে গণশুনানির আয়োজন করুক। তখন উৎপাদন ও ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এম শামসুল আলম বলেন, সরকারি চাকরি কজনই বা করেন। বেসরকারি খাতে অনেকের চাকরি চলে গেছে। অনেকের ব্যবসা–বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় জীবন বাঁচানোর অন্যতম উপাদান পানির দাম বাড়ানো দুঃখজনক।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *